দৈনিক উত্তরের নিউজ
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সাতক্ষীরায় ‘মাস্ক লেডি’ শর্মিষ্ঠার ঘুষের রাজত্বের অভিযোগ: শাস্তিমূলক বদলির পরও থামেনি অনিয়ম?

সাতক্ষীরায় ‘মাস্ক লেডি’ শর্মিষ্ঠার ঘুষের রাজত্বের অভিযোগ: শাস্তিমূলক বদলির পরও থামেনি অনিয়ম?

সবসময় মুখে মাস্ক পরে চলাফেরা করায় স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘মাস্ক লেডি’ নামে। সাতক্ষীরার ভূমি প্রশাসনের এক বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বর্তমান ফিংড়ী ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ উঠে আসছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি কর্মস্থলভিত্তিক দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। কালিগঞ্জের মৌতলা, ভাড়াশিমলা, বসন্তপুর, সদর উপজেলার আগরদাড়ি এবং পৌর ভূমি অফিসসহ একাধিক কর্মস্থলে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পৌর ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে নামজারি, প্রতিবেদন ও বিভিন্ন ভূমি-সংক্রান্ত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সাধারণ নামজারির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হতো এবং জটিল মামলার ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক আরও বৃদ্ধি পেত।

এক ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, আদালতের রায়প্রাপ্ত একটি জমির নামজারির জন্য তার কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমের হাতে রয়েছে বলেও জানা গেছে।

এছাড়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন জমি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে পক্ষপাতমূলক মতামত প্রদান, দালালের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং ভোগান্তি সৃষ্টি করে পরে সমাধানের নামে টাকা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বদলি হলেও থামেনি বিতর্ক

২০০৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান, প্রভাব খাটিয়ে সুবিধাজনক পদায়ন এবং বদলির পরও পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের দাবি, অতীতে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে একাধিকবার বদলি করা হলেও কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অনিয়মের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি।

আগরদাড়ি ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তার জীবনযাপন ও ব্যয়বহুল চলাফেরা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসেনি।

সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নিজের নামে নয়, বরং স্বামী ও নিকট আত্মীয়দের নামে জমি ও অন্যান্য সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর এলাকায় মূল্যবান জমি ক্রয়, ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত এবং আত্মীয়দের নামে সম্পদ গড়ার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য স্থানীয়দের মাধ্যমে সামনে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

অভিযুক্তের বক্তব্য

উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকার তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মইনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি

ভুক্তভোগী, স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক উত্তরের নিউজ

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬


সাতক্ষীরায় ‘মাস্ক লেডি’ শর্মিষ্ঠার ঘুষের রাজত্বের অভিযোগ: শাস্তিমূলক বদলির পরও থামেনি অনিয়ম?

প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬

featured Image


সবসময় মুখে মাস্ক পরে চলাফেরা করায় স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘মাস্ক লেডি’ নামে। সাতক্ষীরার ভূমি প্রশাসনের এক বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বর্তমান ফিংড়ী ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ উঠে আসছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি কর্মস্থলভিত্তিক দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। কালিগঞ্জের মৌতলা, ভাড়াশিমলা, বসন্তপুর, সদর উপজেলার আগরদাড়ি এবং পৌর ভূমি অফিসসহ একাধিক কর্মস্থলে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পৌর ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে নামজারি, প্রতিবেদন ও বিভিন্ন ভূমি-সংক্রান্ত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সাধারণ নামজারির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হতো এবং জটিল মামলার ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক আরও বৃদ্ধি পেত।

এক ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, আদালতের রায়প্রাপ্ত একটি জমির নামজারির জন্য তার কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমের হাতে রয়েছে বলেও জানা গেছে।

এছাড়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন জমি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে পক্ষপাতমূলক মতামত প্রদান, দালালের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং ভোগান্তি সৃষ্টি করে পরে সমাধানের নামে টাকা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বদলি হলেও থামেনি বিতর্ক

২০০৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান, প্রভাব খাটিয়ে সুবিধাজনক পদায়ন এবং বদলির পরও পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে শর্মিষ্ঠা সরকারের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের দাবি, অতীতে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে একাধিকবার বদলি করা হলেও কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অনিয়মের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি।

আগরদাড়ি ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তার জীবনযাপন ও ব্যয়বহুল চলাফেরা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসেনি।

সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নিজের নামে নয়, বরং স্বামী ও নিকট আত্মীয়দের নামে জমি ও অন্যান্য সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর এলাকায় মূল্যবান জমি ক্রয়, ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত এবং আত্মীয়দের নামে সম্পদ গড়ার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য স্থানীয়দের মাধ্যমে সামনে এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

অভিযুক্তের বক্তব্য

উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকার তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মইনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি

ভুক্তভোগী, স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।


দৈনিক উত্তরের নিউজ

সম্পাদকঃ নুর আমিন
সহ-সম্পাদকঃ আরকে. রাসেদ খান
প্রকাশকঃ এম কে পুলক আহম্মেদ
Email: dainikauttareraniuja@gmail.com
web www.dainikuttarernews.com

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উত্তরের নিউজ