দৈনিক উত্তরের নিউজ
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

৩০ বছরেও সংস্কার হয়নি ভাঙা সেতু; দুর্ভোগে কয়েক গ্রামের মানুষ

৩০ বছরেও সংস্কার হয়নি ভাঙা সেতু; দুর্ভোগে কয়েক গ্রামের মানুষ

একটি ভাঙা সেতুর কারণে থমকে আছে সীমান্তঘেঁষা এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের লামাগ্রামের পেঁচাছড়া খালের ওপর নির্মিত সেতুটি দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এই সেতু দিয়েই চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।

লামাগ্রাম একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। উপজেলা সদরের সঙ্গে এর দূরত্ব প্রায় ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার। ভৌগোলিক দূরত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এখানকার মানুষের ভোগান্তি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম এম. তৈয়বুর রহমানের আমলে তার ছোট ভাই রাজা মিয়ার তত্ত্বাবধানে সেতুটি নির্মিত হয়। এতে পূর্ব ও পশ্চিম লামাগ্রামের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। তবে নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় পাহাড়ি ছড়ার প্রবল স্রোতের কারণে সেতুটি দেবে যায়। সরে যায় দুই পাশের এপ্রোচ, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মূল সংযোগ।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩০ বছর। কিন্তু সংস্কার বা পুনঃনির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘ভাঙা ব্রিজ’ নামেই পরিচিত।

সুগভীর খালের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচটি গ্রামের চার শতাধিক শিক্ষার্থী লামাগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামালবস্তি মাদ্রাসা, রনিখাই হুমায়ুন রশীদ উচ্চ বিদ্যালয় ও ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাতায়াত করে। বয়স্ক মানুষদের জন্য এটি যেন মৃত্যুফাঁদ। জরুরি পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও হয়ে পড়ে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

এ সেতুর ওপর নির্ভরশীল প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।

পূর্ব লামাগ্রামের বাসিন্দা কবির মিয়া বলেন, “প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু পার হতে হয়। কোনো মুমূর্ষু রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। আমরা খুব কষ্টে আছি। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।”

উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান মাস্টার বলেন, “সেতুটি দেবে যাওয়ার কারণে কয়েকটি গ্রামের মানুষ চলাচলে ব্যাপক সমস্যায় পড়েছেন। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের অন্যতম পর্যটন স্পট ‘তুরং ছড়া’তে যেতেও এই সেতুই একমাত্র ভরসা। সেতুটি পুননির্মাণ হলে পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

তিনি আরও বলেন, একাধিকবার উপজেলা প্রকৌশলীকে বিষয়টি অবহিত করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আসিফ খান রাবি বলেন, "ভাঙা সেতুটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছি। এটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এখনো প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়নি।"

তিনি বলেন, "সেতু পর্যন্ত আরসিসি সড়কের কাজ শেষ হয়েছে এবং এ পথ ব্যবহার করে পর্যটকরা ‘তুরং ছড়া’ এলাকায় যাতায়াত করেন। সেতুটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রয়েছে। রাস্তসহ সেতুটির উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করা হবে।"

প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা এই ভাঙা সেতুর ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিনের যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই যেন এই ভাঙা কাঠামোর কাছে বন্দি। সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। তিন দশক ধরে পড়ে থাকা ভাঙা সেতুটি মানুষের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে এক অদৃশ্য বাঁধা। সেতুটি পুনঃনির্মাণ হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই সহজ হবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক উত্তরের নিউজ

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬


৩০ বছরেও সংস্কার হয়নি ভাঙা সেতু; দুর্ভোগে কয়েক গ্রামের মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image



একটি ভাঙা সেতুর কারণে থমকে আছে সীমান্তঘেঁষা এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের লামাগ্রামের পেঁচাছড়া খালের ওপর নির্মিত সেতুটি দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এই সেতু দিয়েই চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।

লামাগ্রাম একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। উপজেলা সদরের সঙ্গে এর দূরত্ব প্রায় ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার। ভৌগোলিক দূরত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এখানকার মানুষের ভোগান্তি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম এম. তৈয়বুর রহমানের আমলে তার ছোট ভাই রাজা মিয়ার তত্ত্বাবধানে সেতুটি নির্মিত হয়। এতে পূর্ব ও পশ্চিম লামাগ্রামের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। তবে নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় পাহাড়ি ছড়ার প্রবল স্রোতের কারণে সেতুটি দেবে যায়। সরে যায় দুই পাশের এপ্রোচ, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মূল সংযোগ।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩০ বছর। কিন্তু সংস্কার বা পুনঃনির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘ভাঙা ব্রিজ’ নামেই পরিচিত।

সুগভীর খালের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচটি গ্রামের চার শতাধিক শিক্ষার্থী লামাগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামালবস্তি মাদ্রাসা, রনিখাই হুমায়ুন রশীদ উচ্চ বিদ্যালয় ও ভাটরাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাতায়াত করে। বয়স্ক মানুষদের জন্য এটি যেন মৃত্যুফাঁদ। জরুরি পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও হয়ে পড়ে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

এ সেতুর ওপর নির্ভরশীল প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।

পূর্ব লামাগ্রামের বাসিন্দা কবির মিয়া বলেন, “প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু পার হতে হয়। কোনো মুমূর্ষু রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। আমরা খুব কষ্টে আছি। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।”

উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান মাস্টার বলেন, “সেতুটি দেবে যাওয়ার কারণে কয়েকটি গ্রামের মানুষ চলাচলে ব্যাপক সমস্যায় পড়েছেন। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের অন্যতম পর্যটন স্পট ‘তুরং ছড়া’তে যেতেও এই সেতুই একমাত্র ভরসা। সেতুটি পুননির্মাণ হলে পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

তিনি আরও বলেন, একাধিকবার উপজেলা প্রকৌশলীকে বিষয়টি অবহিত করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আসিফ খান রাবি বলেন, "ভাঙা সেতুটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছি। এটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এখনো প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়নি।"

তিনি বলেন, "সেতু পর্যন্ত আরসিসি সড়কের কাজ শেষ হয়েছে এবং এ পথ ব্যবহার করে পর্যটকরা ‘তুরং ছড়া’ এলাকায় যাতায়াত করেন। সেতুটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রয়েছে। রাস্তসহ সেতুটির উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করা হবে।"

প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা এই ভাঙা সেতুর ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিনের যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই যেন এই ভাঙা কাঠামোর কাছে বন্দি। সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। তিন দশক ধরে পড়ে থাকা ভাঙা সেতুটি মানুষের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে এক অদৃশ্য বাঁধা। সেতুটি পুনঃনির্মাণ হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই সহজ হবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।


দৈনিক উত্তরের নিউজ

সম্পাদকঃ নুর আমিন
সহ-সম্পাদকঃ আরকে. রাসেদ খান
প্রকাশকঃ এম কে পুলক আহম্মেদ
Email: dainikauttareraniuja@gmail.com
web www.dainikuttarernews.com

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উত্তরের নিউজ