সুনামগঞ্জ পৌর শহর যাকে একসময় সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন এবং মুক্তবাতাস ও সবুজ ফসলি জমির এক মনোরম জনপদ হিসেবে চেনা হতো।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার
প্রয়াত চেয়ারম্যান মনোয়ার বখত নেক, জল জোছনার কবি ও প্রয়াত চেয়ারম্যান দেওয়ান মমিনুল মউজদীন এবং প্রয়াত মেয়র আয়ূব বখত জগলুলসহ গুণীজনদের স্মৃতিবিজড়িত এই শহরটিতে অতীতে গবাদিপশুর খাদ্যের কোনো সংকট ছিল না।
চারপাশের চোখ জুড়ানো ফসলি মাঠ আর সবুজ ঘাসে ভরপুর প্রান্তর গোখাদ্যের চাহিদা সহজেই মেটাতো।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত জনবসতি স্থাপনের ফলে সেই ফসলি জমিগুলো আজ কংক্রিটের দালানকোঠা ও বসতিতে রূপ নিয়েছে। এর ফলে শহরজুড়ে তীব্র গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
গোখাদ্য সংকট ও স্থানীয় খামারিদের অসহায়ত্ব
শহরের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গবাদিপশু পালনকারী সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন সচ্ছল নয়।
উচ্চমূল্যের গোখাদ্য কিনে গবাদিপশু লালনপালন করার সামর্থ্য তাদের অনেকেরই নেই।
খাদ্যের সংস্থান করতে না পেরে বাধ্য হয়েই এই গরিব খামারিরা তাদের গরুগুলো দিনে শহরে ছেড়ে দেন। অবুঝ এই প্রাণীগুলো পেটের দায়ে শহরের ময়লা-আবর্জনা ও পচা জিনিস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে এবং দিন শেষে গভীর রাতে নিজ নিজ গৃহস্থের বাড়িতে ফিরে যায়। খামারিদের দাবি, এটি শখের বশে নয়, বরং চরম অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব ও খাদ্যাভাবের কারণে সৃষ্ট এক বাধ্যবাধকতা।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অবুঝ পশুগুলোকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) পক্ষ থেকে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় খামারিরা অভিযোগ করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বদলিযোগ্য চাকুরিজীবী হিসেবে সাময়িকভাবে এখানে অবস্থান করলেও, স্থানীয় বাসিন্দারা জন্মসূত্রে এই মাটিরই সন্তান।
সুনামগঞ্জ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির শহর’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের চেয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি বেশি প্রবল। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেশার তাগিদে আসা নতুন বাসিন্দারা এই দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত নন।
ফলে অবুঝ পশুর সামান্য আচরণ বা ক্ষতি অনেক সময় নতুন বাসিন্দারা মেনে নিতে পারেন না, যা স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করছে।
এই সমস্যার স্থায়ী ও মানবিক সমাধানের জন্য স্থানীয় গবাদিপশু পালনকারীরা প্রশাসনের প্রতি একটি যৌক্তিক ও গঠনমূলক দাবি উত্থাপন করেছেন।
তাদের দাবিগুলো হলো,
১. গোচরভূমি বা খাস জমি বরাদ্দ,শহরের গরিব খামারিদের গবাদিপশু চরণের জন্য সরকারি কোনো খাস জমি বা নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া, ২. ঘাস চাষের উদ্যোগ, বরাদ্দকৃত ওই জমিতে খামারিরা নিজ উদ্যোগে উন্নত জাতের ঘাস ফলানোর মাধ্যমে গবাদিপশুর পুষ্টিকর খাদ্যের সংস্থান করতে পারবেন।৩. সহনশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশাসন এবং নতুন-পুরোনো সব বাসিন্দার পক্ষ থেকে অবুঝ প্রাণী ও প্রান্তিক খামারিদের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল ও সহনশীল আচরণ প্রদর্শন করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিক উন্নয়নের পাশাপাশি এখানকার প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি সম্প্রীতির শহরে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখেই এই সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুষম সমাধান বের করা সম্ভব। প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের যৌথ উদ্যোগেই কেবল ঐতিহ্যবাহী এই শহরের সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখা যেতে পারে।

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
সুনামগঞ্জ পৌর শহর যাকে একসময় সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন এবং মুক্তবাতাস ও সবুজ ফসলি জমির এক মনোরম জনপদ হিসেবে চেনা হতো।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার
প্রয়াত চেয়ারম্যান মনোয়ার বখত নেক, জল জোছনার কবি ও প্রয়াত চেয়ারম্যান দেওয়ান মমিনুল মউজদীন এবং প্রয়াত মেয়র আয়ূব বখত জগলুলসহ গুণীজনদের স্মৃতিবিজড়িত এই শহরটিতে অতীতে গবাদিপশুর খাদ্যের কোনো সংকট ছিল না।
চারপাশের চোখ জুড়ানো ফসলি মাঠ আর সবুজ ঘাসে ভরপুর প্রান্তর গোখাদ্যের চাহিদা সহজেই মেটাতো।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত জনবসতি স্থাপনের ফলে সেই ফসলি জমিগুলো আজ কংক্রিটের দালানকোঠা ও বসতিতে রূপ নিয়েছে। এর ফলে শহরজুড়ে তীব্র গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
গোখাদ্য সংকট ও স্থানীয় খামারিদের অসহায়ত্ব
শহরের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গবাদিপশু পালনকারী সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন সচ্ছল নয়।
উচ্চমূল্যের গোখাদ্য কিনে গবাদিপশু লালনপালন করার সামর্থ্য তাদের অনেকেরই নেই।
খাদ্যের সংস্থান করতে না পেরে বাধ্য হয়েই এই গরিব খামারিরা তাদের গরুগুলো দিনে শহরে ছেড়ে দেন। অবুঝ এই প্রাণীগুলো পেটের দায়ে শহরের ময়লা-আবর্জনা ও পচা জিনিস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে এবং দিন শেষে গভীর রাতে নিজ নিজ গৃহস্থের বাড়িতে ফিরে যায়। খামারিদের দাবি, এটি শখের বশে নয়, বরং চরম অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব ও খাদ্যাভাবের কারণে সৃষ্ট এক বাধ্যবাধকতা।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অবুঝ পশুগুলোকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) পক্ষ থেকে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় খামারিরা অভিযোগ করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বদলিযোগ্য চাকুরিজীবী হিসেবে সাময়িকভাবে এখানে অবস্থান করলেও, স্থানীয় বাসিন্দারা জন্মসূত্রে এই মাটিরই সন্তান।
সুনামগঞ্জ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির শহর’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের চেয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি বেশি প্রবল। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেশার তাগিদে আসা নতুন বাসিন্দারা এই দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত নন।
ফলে অবুঝ পশুর সামান্য আচরণ বা ক্ষতি অনেক সময় নতুন বাসিন্দারা মেনে নিতে পারেন না, যা স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করছে।
এই সমস্যার স্থায়ী ও মানবিক সমাধানের জন্য স্থানীয় গবাদিপশু পালনকারীরা প্রশাসনের প্রতি একটি যৌক্তিক ও গঠনমূলক দাবি উত্থাপন করেছেন।
তাদের দাবিগুলো হলো,
১. গোচরভূমি বা খাস জমি বরাদ্দ,শহরের গরিব খামারিদের গবাদিপশু চরণের জন্য সরকারি কোনো খাস জমি বা নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া, ২. ঘাস চাষের উদ্যোগ, বরাদ্দকৃত ওই জমিতে খামারিরা নিজ উদ্যোগে উন্নত জাতের ঘাস ফলানোর মাধ্যমে গবাদিপশুর পুষ্টিকর খাদ্যের সংস্থান করতে পারবেন।৩. সহনশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশাসন এবং নতুন-পুরোনো সব বাসিন্দার পক্ষ থেকে অবুঝ প্রাণী ও প্রান্তিক খামারিদের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল ও সহনশীল আচরণ প্রদর্শন করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিক উন্নয়নের পাশাপাশি এখানকার প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি সম্প্রীতির শহরে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখেই এই সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুষম সমাধান বের করা সম্ভব। প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের যৌথ উদ্যোগেই কেবল ঐতিহ্যবাহী এই শহরের সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখা যেতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন